x 
Empty Product
Monday, 30 September 2013 09:03

সাধারণ চাষীরা নয়, আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট

Written by 
Rate this item
(0 votes)

 সাধারণ চাষীরা নয়, আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিকযুক্ত আম আর বিষ খাওয়ার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই

অসময়ে আম কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অধিক সচেতন হওয়া দরকার

বাঙ্গালির অতিপ্রিয় ফল আমের পচন রোধে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে! গাছে মুকুল আসার পর থেকে পাকা পর্যন্ত বাগানে, আড়তে দফায় দফায় আমে দেয়া হচ্ছে সায়ানাইড, ফরমালিনসহ নানা ধরনের কেমিক্যাল। আমের রাজধানী বলে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও মেহেরপুর, রাজশাহী, নাটোর ও অন্যান্য জেলায় এই অসাধু কার্যক্রম চালাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বাগান মালিক, চাষী থেকে শুরু করে স্থানীয় ফল ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কোথায়, কখন, কিভাবে আমে বিষ মেশানো হয় সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।
Rajshahi Mango
এদিকে গত বৃহস্পতিবার কাওরান বাজারের ৬টি আড়তে আমে মাত্রাতিরিক্ত ফরমালিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল থাকার প্রমাণ পেয়েছে মোবাইল কোর্ট। বিষাক্ত কেমিক্যালে ভরা এই আম খাওয়া আর বিষ খাওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এই আম খেলে মানবদেহে নানা ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, মধ্যস্বত্বভোগী, অতি মুনাফালোভী, ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ও বাগান মালিক এবং আড়তদাররা আমে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও ফরমালিন মিশিয়ে বছরের পর বছর বাজারজাত করছে। মূলত তাদের হাতেই দেশের ফল ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত হয়। বাজারে ৯৫ ভাগ আমের মধ্যেই বিষাক্ত কেমিক্যাল রয়েছে। তার বাস্তব প্রমাণও মিলছে। প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল কোর্ট অভিযানে নেমে টনে টনে কেমিক্যাল যুক্ত আম ধ্বংস করে সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করছেন। কিন্তু অজানা কারণে আমে বিষ মেশানো বন্ধ হচ্ছে না।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার কাওরান বাজারে ১০টি আমের আড়তে র্যাবের মেজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসব আড়তে সরাসরি আম আনা হয় বলে দাবি করা হয়। বিশেষজ্ঞরা ৬টি আড়তে মালিকদের উপস্থিতিতে আম পরীক্ষা করে তাতে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল থাকার প্রমাণ পান। এ কারণে প্রত্যেক আড়ত মালিককে দুই লাখ টাকা করে জরিমানা এবং ৪ হাজার টন আম জব্দ করে মোবাইল কোর্ট। পরে সেই আম ধ্বংস করা হয়।

আমে কেমিক্যাল মেশানো সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসী অনুষদের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, আম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাকে। কিন্তু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা উচ্চ মূল্যে বিক্রি করার জন্য অপরিপক্ক আম কেমিক্যাল দিয়ে আগেই পাকিয়ে ফেলে। আর পচন রোধে অর্থাত্ দীর্ঘদিন তরতাজা রেখে বিক্রির জন্য সেই আমে মেশানো হয় ফরমালিন। এই আম পাকা ও তরতাজা দেখে এক শ্রেণীর ক্রেতা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ৪০ টাকা কেজির আম ১শ' টাকা কেজিতে কিনতেও দ্বিধা করেন না ক্রেতারা। তারা জানেন না যে, টাকা দিয়ে ফলের নামে বিষ কিনে নিয়ে গেছেন পরিবারের জন্য। এই সকল ক্রেতার মন-মানসিকতার পরিবর্তন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আ ব ম ফারুক আরো জানান, কোন্ সময় কোন্ আম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাকে তা অনেকেই জানে। রাজশাহীর লেংড়া আম অনেক আগেই বাজারে আসে। এই লেংড়া আম আষাঢ় মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে পাকা শুরু হয়। চোষা, ফজলি, হিমসাগর আমও ওই সময় পাকতে শুরু করে। কিন্তু এ সকল আম অনেক আগেই বাজারে দেখা যায়। একই ভাবে গুটি আম, বোম্বাই, গোপালভোগ, লক্ষণভোগ জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে বাজারে আসার কথা। কিন্তু সেসব আমও বৈশাখ মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে পাওয়া যায়। ক্রেতাদের মনে রাখতে হবে, অমৌসুমে এসব আম স্বাভাবিকভাবে পাকে না। এতে যে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও ফরমালিন রয়েছে তা শতভাগ নিশ্চিত। তিনি ক্রেতাদের আম কেনার ক্ষেত্রে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

মহাখালীর ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফাও ইত্তেফাককে জানান, 'সায়ানাইড' দিয়ে আম পাকানো হয়। দীর্ঘদিন রেখে বিক্রির জন্য সে আমে মেশানো হয় ফরমালিন। এই দুটি কেমিক্যালেই মানবদেহে মরণব্যাধি ক্যান্সার হওয়ার আশংকা শতভাগ। দেশে ক্যান্সার রোগ আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বিষাক্ত আমসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দায়ী। ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিত্সার জন্য আসেন। তা সামাল দেয়া চিকিত্সকদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে বলে তিনি জানান।

আম পাকাতে প্রয়োগ হচ্ছে ভারতীয় বিষ

সপ্তাহব্যাপী মেহেরপুর জেলায় কয়েকটি বাগান ও বাজার ঘুরে আম পাকানোর বিভিন্ন কেমিক্যাল এর সন্ধান পাওয়া গেছে। যেগুলো সীমান্তের ওপার থেকে সীমান্ত রক্ষীদের বকশিশ দিয়ে অধিক মুনাফার লোভে চোরাচালানীরা প্রতিদিন নিয়ে আসছে। তা দ্রুত চলে যাচ্ছে আম ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকদের হাতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলার আমঝুপী ইউনিয়নের এক বাগান মালিক বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং চাঁদাবাজদের অত্যাচারে আম পাকার আগেই তা পেড়ে ফেলতে হচ্ছে। তাই আম পাকানোতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারতীয় বিষ ইতোফোন গ্রুপের রাইজার, হারভেস্ট, প্রমোড ও ক্রমপমেক্স। অন্যদিকে মুজিবনগর উপজেলার কেদারগঞ্জের এক বাগান মালিক বলেন, ফুল ও ফল অধিক পরিমাণে গাছে আনতে ভারতীয় কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করতাম কিন্তু অধিক মুনাফার জন্য এখন সেগুলোই আম ও লিচু পাকানোতে ব্যবহার করছি। তাতে লাল টুকটুকে রং চলে আসছে যদিও ভিতরে ফলের কিছুটা অংশ কাঁচা থেকে যাচ্ছে।

মেহেরপুরের বড় বাজারের এক ফল ব্যবসায়ী বলেন, মসজিদ-মন্দিরের কমিটির লোকেরা যখন ভাল মন্দের হিসাব ঠিক রাখতে পারে না, তখন আমরা পরিবার বাঁচাতে ফলে এক আধ চামচ কি দিলাম সেই খোঁজ নিতে এসেছেন।

জানা গেছে, ভারতীয় বিষ ইতোফোন গ্রুপের ক্রমপমেক্স-এর চাহিদা প্রচুর। ১২০ থেকে ১৫০ টাকা মূল্যের এক বোতল বিষে ৪০/৬০ মণ আম পাকনো যায়। মেহেরপুর বামনপাড়ার এক কলা ব্যবসায়ী বলেন, আম কলা লিচুর রং আনতে ভারতীয় কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকি। কেননা রং এলে বাজারে ফলের চাহিদা বেড়ে যায়। আমে রাসায়নিক মেশানো সম্পর্কে স্থানীয় চিকিত্সক ডা. হিমাংশু পোদ্দার বলেন, কেমিক্যাল মেশানো ফলে মানবদেহে হতে পারে মারাত্মক ক্যান্সার। হতে পারে পেটের পীড়া, বয়ে বেড়াতে হতে পারে আজীবন চর্মরোগ।

নাটোরের লালপুর উপজেলায় আমের মুকুল বের হওয়া থেকে শুরু করে গাছ থেকে আম পাড়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পোকার আক্রমণ, ছত্রাক রোধ ও আমের রং আকর্ষণীয় করার জন্য দফায় দফায় ব্যবহার করা হচ্ছে শ্যাম্পু ও নানা ধরনের বিষ।

আম ব্যবসায়ীরা জানান, মুকুল আসার আগে গাছের গোড়ায় সার প্রয়োগ ও প্রয়োজনে সেচ দেয়া হয় এবং পাতায় ম্যালথান গ্রুপের কীটনাশক কট, টিডো, ফাইটার ইত্যাদি স্প্রে করা হয়। গাছে মুকুল দেখা দিলে সামান্য কীটনাশকের সাথে ম্যানকোজের গ্রুপের ডায়াথেন অথবা কার্বন্ডাজিন গ্রুপের নইন পাওডার পানিতে গুলিয়ে স্প্রে করা হয়। তারপর আমের গুটি বড় হওয়া পর্যন্ত এনটাকল, নইন, ডায়াথেন, ব্যাপিস্টিন, ফ্লোরা, ফাইটার, টিডো ইত্যাদি ছত্রাক নাশক ও কীটনাশক স্প্রে করা হয়। আমের উপরের ময়লা পরিষ্কারের জন্য শ্যাম্পু, বোরন, ফলিকুর, রোব্রাল নামের তরল ওষুধ এবং গাছ থেকে আম পাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে নইন, টিডো, প্রিমিয়ার, এন্টাকল নামের বিষ। গোপালপুর বাজারের একজন কীটনাশক ব্যবসায়ী জানান, আম ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ গাছ থেকে আম পাড়ার পর দ্রুত পাকানোর কাজে ফ্লোরা নামের এক ধরনের ওষুধ ব্যবহার করছেন।

আম ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন জানান, আমের রং ভাল না হলে দাম পাওয়া যায় না তাই গাছ থেকে আম পাড়ার আগে এন্টাকল ও নইন নামের ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। তবে তারা এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানেন না বলে দাবি করেন।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আকরাম হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, বিষাক্ত কেমিক্যাল যুক্ত আম খাওয়ার পর শরীরের বিভিন্ন স্থানে সেই কেমিক্যাল জমা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে তা ক্যান্সার সৃষ্টি করে। গর্ভবতী মায়েদের চিকিত্সকরাই ফল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সেই কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফল খাওয়ার পর গর্ভবতী মা ও তার পেটের সন্তান উভয়ের মরণব্যাধি ক্যান্সার হওয়ার আশংকা বেশি বলে তিনি জানান।

কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. হারুনুর রশিদ বলেন, মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল মেশানো আম খেলে কিডনি নষ্ট হওয়ার আশংকা বেশি। গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য এই ফল খাওয়া সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে তিনি জানান।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো আম খেলে নার্ভ দুর্বল হয়ে নিউরোপ্যাথি রোগ হওয়ার আশংকা বেশি। ওই সকল কেমিক্যালের টক্সিনের প্রভাব পড়ে নার্ভে। এর ফলে ব্রেইনে ও নার্ভের মারাত্মক ক্ষতি হয়। গর্ভবতী মা ওই ফল খেলে তার পেটের সন্তান বিকলাঙ্গ ও হাবাগোবা হওয়ার আশংকা থাকে। দেশে বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার এটি অন্যতম কারণ বলে তিনি জানান।

এদিকে জানা গেছে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দেশের আমের চাহিদার ৮০ ভাগ উত্পাদন হয়ে থাকে। ওই দুটি জেলায়ও আম বাগানের মুকুল বের হওয়া থেকে শুরু করে আম গাছ হতে পাড়ার পূর্ব পর্যন্ত পোকার আক্রমণ, ছত্রাক রোধ ও আমের রং আকর্ষণীয় করতে, অপরিপক্ব অবস্থায় আম পাকাতে ও দীর্ঘদিন রেখে বিক্রির জন্য নানা ধরনের কেমিক্যাল দেয়া হয়।

রাজশাহী ফল গবেষণা ইন্সটিউিটের গবেষণা কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলিম এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, আমে নানা ধরনের কীটনাশক, কেমিক্যাল বাগান মালিক ব্যবসায়ী ও আড়ত্ মালিকরা মেশান। প্রকৃত আম চাষীরা এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। পোকাও আমের জন্য অনেক উপকারী। সেই পোকাও তারা মেরে ফেলে। মৌমাছির মত পিরপিট, ব্লু-ফ্লাই ও হাউজ ফ্লাই জাতীয় পোকা আমের জন্য খুবই উপকারী বলে তিনি জানান।

প্রসঙ্গত চলতি বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৩ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে ১৮ লাখ গাছে আমের ফলন হয়েছে। উত্পাদনের টার্গেট ২ লাখ ১৫ হাজার মে.টন। এই জেলায় গত বছর ১ লাখ ৬৮ হাজার মে.টন আম উত্পাদন হয়েছিলো। অন্যদিকে বৃহত্তর রাজশাজীতে এবার ৫ লাখ মেট্রিক টন আম উত্পাদনের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অঞ্চলে প্রায় অর্ধলাখ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে।

 


http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDZfMTVfMTNfMV8yXzFfNDg3ODQ=

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন: ইত্তেফাকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি তসলিম উদ্দিন, মেহেরপুর প্রতিনিধি আবু লায়েছ লাবলু, রাজশাহী প্রতিনিধি আনিসুজ্জামান ও নাটোরের লালপুর সংবাদদাতা মোজাম্মেল হক।

 

 

Read 1770 times Last modified on Sunday, 01 December 2013 09:45

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.